Monday, January 26, 2026

ভূগোলিকা-Bhugolika

ভূগোল শিক্ষার অনন্য প্রতিষ্ঠান

ভূগোলিকা-Bhugolika

ভূগোল শিক্ষার অনন্য প্রতিষ্ঠান

ভৌগোলিক প্রবন্ধ

Fourth Industrial Revolution

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব

ভূগোলিকা-Bhugolika -এর ‘ভৌগোলিক প্রবন্ধ’ বিভাগে আপনাকে স্বাগত জানাই। ভৌগোলিক প্রবন্ধে আমরা ভূগোলের নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বিস্তারিত তথ্য পেয়ে থাকি, যা আমাদের ভৌগোলিক জ্ঞানের বিকাশে সহায়ক হয়। আজকের ভৌগোলিক প্রবন্ধ : Fourth Industrial Revolution । আশাকরি, এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আপনি চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাবেন।

Fourth Industrial Revolution

আধুনিক মানবসভ্যতার আর্থ-সামাজিক বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে শিল্প বিপ্লব এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যখন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থার অগ্রগতি মানব সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তির ব্যাপক, দ্রুত ও সুদুরপ্রসারী পরিবর্তন সাধন করে, তখন তাকে শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) বলে। শিল্প বিপ্লবের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল — (১) নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন (২) আধুনিক যন্ত্র নির্ভরতা (৩) অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন (৪) ধারাবাহিক প্রসার (৫) পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিকাশ। ইতিহাস বলছে, ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি কূটনীতিক লুই-গীউম অটো (Louis-Guillaume Otto) সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন। তবে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন অর্থে ১৮৩৭ সালে ফরাসি অর্থনীতিবিদ অ্যাডলফ ব্লাঙ্কি (Adolphe Blanqui) সর্বপ্রথম শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution) শব্দবন্ধটি ব্যবহার করেন।

ভৌগোলিক প্রবন্ধ : প্রসঙ্গ – সুন্দরবনের মাছ

মানবসভ্যতার আধুনিক ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত ৩ টি শিল্প বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে — (১) প্রথম শিল্প বিপ্লব (First Industrial Revolution ; সময়কাল – ১৭৬০-১৮৪০) : এই শিল্প বিপ্লবে কৃষিভিত্তিক সমাজ কায়িক শ্রম থেকে যন্ত্র-নির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্পোন্নত সমাজে রূপান্তরিত হয় এবং কারখানা ব্যবস্থা, নগরায়ণ, নতুন পরিবহন ব্যবস্থা, জনবৃদ্ধি, নতুন সামাজিক শ্রেণীকাঠামো ইত্যাদি সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছিল। ব্রিটেনে প্রথম শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। (২) দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব (Second Industrial Revolution ; সময়কাল – ১৮৭০-১৯১৪) : এই শিল্প বিপ্লবে বিশেষত ইস্পাত, বিদ্যুৎ ও পেট্রোলিয়াম ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার মানোন্নয়নে উৎপাদন ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও দৈনন্দিন মানবজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এবং বৃহৎ প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক বাজার (Global Market) -এর উন্নতি ঘটেছিল। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও জার্মানিতে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। এই শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তিগত বিপ্লব (Technological Revolution) নামেও পরিচিত। (৩) তৃতীয় শিল্প বিপ্লব (Third Industrial Revolution ; সময়কাল – ১৯৬৯-২০১০) : এই শিল্প বিপ্লবে বিশেষত ইলেকট্রনিক্স, কম্পিউটার, টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অ্যানালগ থেকে ডিজিটাল প্রযুক্তির রূপান্তর ঘটে এবং জৈবপ্রযুক্তি গবেষণা ও মহাকাশ অভিযানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছিল এবং রোবোটিক্স (Robotics), প্রোগ্রামেবল লজিক কন্ট্রোলার (PLC), কম্পিউটার-এইডেড ডিজাইন (CAD) -এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় (Automation) যুগের সূচনা হয়েছিল। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানে তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল। এই শিল্প বিপ্লব ডিজিটাল বিপ্লব (Digital Revolution) নামেও পরিচিত।

ভৌগোলিক প্রবন্ধ : মুর্শিদাবাদের আহিরণ বিল

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (Fourth Industrial Revolution) হল অত্যাধুনিক ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির মাধ্যমে ভৌত, ডিজিটাল ও জৈবিক ব্যবস্থার সংমিশ্রণ, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ইন্টারনেট অফ থিংস্ (IoT), রোবোটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং বিগ ডেটার মতো প্রযুক্তির দ্বারা পরিচালিত হয় এবং যা উন্নত স্বয়ংক্রিয় (Automation), উৎপাদনশীলতা ও নতুন ব্যবসায়িক মডেলের জন্য স্মার্ট, সংযুক্ত প্রণালী ও ডেটা বিনিময়ের মাধ্যমে শিল্প, অর্থনীতি ও সমাজকে মৌলিকভাবে রূপান্তরিত করে। ২০১১ সালে জার্মান সরকারের উচ্চ-প্রযুক্তি কৌশল (Hi-Tech Strategy) -এর অংশ হিসাবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (Fourth Industrial Revolution) শব্দবন্ধটির উৎপত্তি ঘটে এবং ২০১১ সালের ১ লা এপ্রিল হ্যানোভার মেস (Hannover Messe) শীর্ষক শিল্প প্রদর্শনীতে সর্বপ্রথম চতুর্থ শিল্প বিপ্লব (Fourth Industrial Revolution) শব্দবন্ধটি জনসমক্ষে প্রচারিত হয়, যা শিল্প ৪.০ (Industry 4.0) নামেও পরিচিত। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (World Economic Forum) -এর প্রতিষ্ঠাতা ও জার্মান প্রকৌশলী ক্লাউস শোয়াব (Klaus Schwab) ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বরে আমেরিকান ম্যাগাজিন ফরেন অ্যাফেয়ার্স (Foreign Affairs) -এ প্রকাশিত তাঁর ‘The Fourth Industrial Revolution — What It Means and How to Respond‘ শীর্ষক প্রবন্ধে এবং ২০১৬ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) কর্তৃক প্রকাশিত তাঁর ‘The Fourth Industrial Revolution‘ শীর্ষক গ্রন্থে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা প্রদান করেন।

ইনস্টিটিউট অফ ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স (IEEE) থেকে প্রকাশিত ‘Design Principles for Industrie 4.0 Scenarios‘ শীর্ষক এক প্রতিবেদন অনুসারে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ৪ টি উপাদান হল — সাইবার-ভৌত প্রণালী (Cyber-Physical System/ CPS), ইন্টারনেট অফ থিংস্ (IoT), ইন্টারনেট অফ সার্ভিসেস্ (IoS) এবং স্মার্ট ফ্যাক্টরি (Smart Factory)। উপরোক্ত প্রতিবেদন অনুসারে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপাদানগুলি থেকে প্রাপ্ত ৬ টি পরিকল্পনা নীতি হল — (১) আন্তঃক্রিয়াশীলতা (Interoperability) (২) কল্পনায়ন (Virtualization) (৩) বিকেন্দ্রীকরণ (Decentralization) (৪) বাস্তব-সময় ক্ষমতা (Real-Time Capability) (৫) পরিষেবা ঝোঁক (Service Orientation) এবং (৬) একক-ভিত্তিক বৈশিষ্ট্য (Modularity)। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তি হল — চলমান যন্ত্র (Mobile Device), অবস্থানগত শনাক্তকরণ প্রযুক্তি – বৈদ্যুতিন শনাক্তকরণ (Locational Detection Technology – Electronic Identification), উন্নত মানব-যন্ত্র সংযোগস্থল (Advanced Human-Machine Interface), প্রমাণীকরণ এবং জালিয়াতি শনাক্তকরণ (Authentication & Fraud Detection), দক্ষ সংবেদক (Smart Sensor), বৃহৎ বৈশ্লেষিক এবং উন্নত প্রক্রিয়া (Big Analytics & Advanced Process), বহুস্তরীয় গ্রাহক মিথস্ক্রিয়া এবং গ্রাহক রূপরেখা তৈরি (Multilevel Customer Interaction & Customer Profiling), বর্ধিত বাস্তবতা/পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি (Augmented Reality/Wearable Technology), চাহিদা-অনুসারে কম্পিউটার ব্যবস্থা সম্পদের প্রাপ্যতা (On-demand Availability of Computer System Resources), তথ্য দৃশ্যায়ন (Data Visualisation) ইত্যাদি।

বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ (যেমন — আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, উগান্ডা ইত্যাদি) চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তি গ্রহণকে উৎসাহিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা স্থাপন করেছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা হল — উচ্চ ব্যয় ও অস্পষ্ট অর্থনৈতিক সুবিধা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা বিষয়ক উদ্বেগ, জটিল যন্ত্র থেকে যন্ত্র যোগাযোগ স্থাপন, অস্পষ্ট আইনি ব্যবস্থা এবং তথ্য সুরক্ষা, ব্যবস্থাপনা ও মানদন্ডের অভাব ইত্যাদি। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কি প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দ্বিমত রয়েছে। এক মতে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে সব মানুষেরই আয়ের পরিমাণ ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে। ডিজিটাল প্রযুক্তিতে বিশ্বের পণ্য সরবরাহ প্রক্রিয়াতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য রপ্তানি ব্যয় হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। অন্য মতে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের ফলে বিশ্বের অসাম্য ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি আরও বৃদ্ধি পাবে। রোবট ও যন্ত্রপাতির অধিক ব্যবহারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে সমস্যা হবে। শ্রমবাজারে অল্প কর্মদক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা ও বাজার কমে যাবে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলির জন্য এক বড়ো সমস্যা। এছাড়া, সারা বিশ্বে সম্পদ বৈষম্য আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।

SSC Upper Primary TET Social Studies (Bengali Version)

লেখকঃ- অরিজিৎ সিংহ মহাপাত্র (পার্শ্বলা, বাঁকুড়া)
তথ্যসূত্রঃ- (১) Industry 4.0 : The Role of IIoT in Digital Transformation of the Manufacturing Sector,
Author : Estera Włodarczyk, Publisher : Comarch Technologies
(২) The Fourth Industrial Revolution — What It Means and How to Respond (2015) – Klaus Schwab – Foreign Affairs Magazine
(৩) The Fourth Industrial Revolution (2016) – Klaus Schwab – World Economic Fourm
(৪) Design Principles for Industrie 4.0 Scenarios (2015) – Mario Hermann, Tobias Pentek, Boris Otto – IEEE
(৫) A Brief History of The 4 Industrial Revolutions that Shaped the World (2019) – Institute of Entrepreneurship Development (iED)

ভৌগোলিক প্রবন্ধ : থাঞ্জাভুর – দক্ষিণ ভারতের শস্যভান্ডার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!