Blood Falls of Antarctica
আন্টার্কটিকার রক্ত প্রপাত
ভূগোলিকা-Bhugolika -এর ‘ভৌগোলিক প্রবন্ধ’ বিভাগে আপনাকে স্বাগত জানাই। ভৌগোলিক প্রবন্ধে আমরা ভূগোলের নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর বিস্তারিত তথ্য পেয়ে থাকি, যা আমাদের ভৌগোলিক জ্ঞানের বিকাশে সহায়ক হয়। আজকের ভৌগোলিক প্রবন্ধ : Blood Falls of Antarctica । আশাকরি, এই প্রবন্ধের মাধ্যমে আপনি আন্টার্কটিকার ‘রক্ত প্রপাত’ সম্পর্কে বিশদ তথ্য পাবেন।

রক্ত প্রপাত (Blood Falls) আন্টার্কটিকার একটি বিরল প্রাকৃতিক বিস্ময়। রক্ত প্রপাত হল লৌহ অক্সাইড (Ferric Oxide) মিশ্রিত লবণাক্ত জলের প্রবাহ, যা পূর্ব আন্টার্কটিকা (East Antarctica)-এর ভিক্টোরিয়া ল্যান্ড (Victoria Land)-এর ম্যাকমুর্ডো শুষ্ক উপত্যকা (McMurdo Dry Valleys)-এর অন্তর্গত টেলর উপত্যকা (Taylor Valley)-তে টেলর হিমবাহ (Taylor Glacier)-এর জিহ্বা থেকে নির্গত হয়ে বোনি হ্রদ (Lake Bonney)-এর পশ্চিমাংশে বরফাবৃত পৃষ্ঠে পতিত হয়েছে। লৌহ অক্সাইড সমৃদ্ধ অত্যধিক লবণাক্ত জল বিক্ষিপ্তভাবে বরফের ধাপের ছোট ছোট ফাটলগুলি থেকে নির্গত হয়। এই লবণাক্ত জলের উৎস হল এক প্রাচীন অতি-লবণাক্ত হ্রদ (Hypersaline Lake), যা টেলর হিমবাহের ৪০০ মিটার পুরু বরফের নিচে রয়েছে।
১৯১১ সালে অস্ট্রেলিয়ান ভূতত্ত্ববিদ টমাস গ্রিফিথ টেলর (Thomas Griffith Taylor) সর্বপ্রথম এই উপত্যকা অন্বেষণ কালে লালচে সঞ্চয় খুঁজে পেয়েছিলেন। তাই, তাঁর নামেই উপত্যকাটির নামকরণ করা হয়েছে ‘টেলর উপত্যকা’। রক্তের ন্যায় অস্বাভাবিক লালচে-বাদামি রঙের জন্যই আন্টার্কটিকার এই জলপ্রপাত ‘রক্ত প্রপাত’ নামে পরিচিত। তবে এই রক্তাভ জলপ্রবাহ আসলে কী উপাদান দিয়ে তৈরি এবং কেন এত শীতল পরিবেশেও জল প্রবাহিত হয়, তা দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের নিকট একটি রহস্যই ছিল। ১৯১১ সালে যখন এই রক্ত প্রপাত আবিষ্কৃত হয়েছিল, তখন বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছিলেন যে, লাল রঙের শৈবাল (Algae) জলের লালচে রঙের কারণ। পরবর্তী কালে, বিশদ গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয় লৌহ অক্সাইডের প্রাচুর্যই জলকে রক্তের ন্যায় লাল করে তুলেছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, টেলর হিমবাহের নিচের পৃষ্ঠ কঠিন হিমায়িত অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞানীরা রেডিও-প্রতিধ্বনি প্রযুক্তি ব্যবহার করে আবিষ্কার করেন যে, টেলর হিমবাহের নিচে অত্যধিক লবণাক্ত (সমুদ্রের জলের চেয়ে তিনগুণ লবণাক্ত) জলাধার রয়েছে। হিমবাহের নিচে যেখানে উষ্ণতা সর্বদা হিমাঙ্কের নিচে, সেখানেও অতিরিক্ত লবণতার জন্যই এই হিমবাহ নিম্নস্থ হ্রদের জল তরল অবস্থায় রয়েছে। প্রায় ৫০ লক্ষ বছর আগে, পূর্ব আন্টার্কটিকার এই অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে প্লাবিত হয় এবং সামুদ্রিক ফিয়র্ড ব্যবস্থার অন্তর্গত একটি অন্তর্দেশীয় লবণাক্ত হ্রদ (Inland Saline Lake) তৈরি হয়। প্রায় ১৫-২০ লক্ষ বছর পূর্বে ওই লবণাক্ত হ্রদটি হিমবাহের নিচে আবদ্ধ হয়ে রয়েছে।
ভৌগোলিক প্রবন্ধ : প্রসঙ্গ – কার্স্ট ভূমিরূপ স্পেলিওথেম
এনিয়ে বিশদ গবেষণা করতে গিয়ে, ২০১৪-১৫ সালে জিল মিকাকি (Jill Mikucki)-এর নেতৃত্বে এক গবেষক দল আইসমোল (IceMole) ব্যবহার করে টেলর হিমবাহ থেকে প্রাপ্ত লবণাক্ত জল (Brine) থেকে প্রথম সরাসরি নমুনা সংগ্রহ করেছিলেন। আইসমোল হল এমন একটি পদ্ধতি, যা চারপাশের বরফ গলিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে থাকে। এই গবেষণায় গবেষকরা ৫৬ ফুট (১৭ মিটার) বরফের নিচে আইসমোল পাঠিয়েছিলেন টেলর হিমবাহের ব্রাইন সংগ্রহ করার জন্য। ব্রাইন হল জলে লবণের উচ্চ ঘনত্বের দ্রবণ। আয়ন ঘনত্ব, লবণতা এবং অন্যান্য দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ সহ ভূ-রাসায়নিক তথ্য পেতে ব্রাইন গুরুত্বপূর্ণ। সংগৃহীত ব্রাইন পরীক্ষা করে, দ্রবীভূত নাইট্রোজেন, ফসফরাস এবং কার্বনের পরিলক্ষিত ঘনত্বের উপর ভিত্তি করে, গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, টেলর হিমবাহের নিচে ‘সাব-গ্লেসিয়াল’ (Sub-glacial) পরিবেশ উচ্চ লোহা এবং সালফেটের ঘনত্বের সাথে এক সক্রিয় মাইক্রোবায়োলজিক্যাল অবস্থায় রয়েছে।
রক্ত প্রপাত একটি প্রাকৃতিক বিষয়, কোনো অতিপ্রাকৃত ব্যাপার নয়। এটি পূর্ব আন্টার্কটিকার টেলর হিমবাহের প্রান্তে লৌহ অক্সাইড সমৃদ্ধ লবণাক্ত জলের একটি তরল প্রবাহ। আসলে আন্টার্কটিকার আদিশিলায় লৌহ রয়েছে, যা পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ উপাদানগুলির মধ্যে একটি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন টেলর হিমবাহে অবঘর্ষ (স্ক্র্যাপিং মোশন) এবং এক্সট্রিমোফিল (Extremophile) শ্রেণীর অস্বাভাবিক জীবাণুর ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে লোহা ওই ‘সাব-গ্লেসিয়াল’ হ্রদে প্রবেশ করছে। এক্সট্রিমোফিল হল এমন এক শ্রেণীর ব্যাকটেরিয়া, যা অতি শীতল এবং ফুটন্ত তাপমাত্রা সহ অত্যন্ত কঠিন পরিবেশেও বেঁচে থাকে ও তাদের কাজ চলিয়ে যেতে পারে। আবার এই ব্যাকটেরিয়াগুলি গভীর সমুদ্রে অতি উত্তপ্ত হাইড্রোথার্মাল ভেন্টের কাছেও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। এক্সট্রিমোফিল অবশ্য সালোকসংশ্লেষ পদ্ধতিতে আলো ও অক্সিজেন ব্যবহার করে শক্তি/খাদ্য উৎপাদন করেনা। তারা কেমোসিন্থেসিস প্রক্রিয়াতে শক্তি/খাদ্য উৎপাদন করে। কেমোসিন্থেটিক জীব সালফার এবং লোহার যৌগকে (সূর্যের আলো এবং অক্সিজেন নয়) শক্তিতে রূপান্তর করতে সক্ষম।
ভৌগোলিক প্রবন্ধ : মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা বৃদ্ধি
এই রক্ত প্রপাত অঞ্চলটি আন্টার্কটিক অভিযাত্রী, হিমশৈলবিদ, লিমনোলজিস্ট ও মাইক্রোবায়োলজিস্টদের আগ্রহের একটি বিশেষ স্থান। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা, যারা পৃথিবীর বাইরে জীবনের সম্ভাবনা অধ্যয়ন করেন, তারাও রক্ত প্রপাত এবং এর অস্বাভাবিক জীবাণু সম্প্রদায়ের প্রতি আগ্রহী। রক্ত প্রপাত একটি কঠিন পরিবেশে বরফের নিচে কীভাবে জীবন থাকতে পারে তার একটি মডেল প্রদান করে। এখানে অক্সিজেন নেই, আলো নেই, তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে রয়েছে। তাই, অনেক জ্যোতির্বিজ্ঞানী মনে করেন যে, বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহ ইউরোপা-এর বরফের ভূত্বকের নীচে যে বিশাল তরল সমুদ্র রয়েছে, সেখানে এই ধরনের ব্যাকটেরিয়া দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এসব কারণে রক্ত জলপ্রপাত জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার জন্য একটি জনপ্রিয় অঞ্চল রূপে পরিচিত লাভ করেছে। কে বা ভেবেছিল যে, পৃথিবীর দুর্গম, প্রত্যন্ত এই অঞ্চলটি ভিনগ্রহ এবং উপগ্রহগুলি জীবন ধারণ করতে সক্ষম কিনা তার উত্তর ধরে রাখতে পারে? টেনেসি বিশ্ববিদ্যালয় (University of Tennessee) কর্তৃক পরিচালিত একটি গবেষণা (২০০৯)-তে দেখা গেছে যে, রক্ত প্রপাতের জলের নমুনাতে মোট ১৭ ধরনের অণুজীব পাওয়া গেছে। রাসায়নিক এবং জীবাণু বিশ্লেষণ উভয়ই ইঙ্গিত দেয় যে, এখানে ব্যাকটেরিয়ার এক বিরল ‘সাব-গ্লেসিয়াল ইকোসিস্টেম’ বিকশিত হয়েছে, যা সালফেট এবং লৌহ বিপাক করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই ধরনের বরফাবৃত হ্রদই ৬৫-৭৫ কোটি বছর আগে প্রোটেরোজোয়িক যুগে পৃথিবীর অণুজীব বাস্তুতন্ত্রের হদিশ দিতে পারে।
উচ্চ মাধ্যমিক ভূগোল নির্যাস [XI : Semester-II]
লেখকঃ- সুব্রত পাল (বেলিয়াতোড়, বাঁকুড়া)
তথ্যসূত্রঃ- Wikipedia ; EarthSky ; National Geographic ; Forbes Magazine ; Blood Falls/National Geographic Society ; Blood-Falls in Antarctica/Polarjournal ; Explorers Web ; Cambridge University Press
Pingback: Eco-friendly Sal Leaf of Jhargram - ভূগোলিকা-Bhugolika
Pingback: Topic - International Day of the World's Indigenous Peoples - ভূগোলিকা-Bhugolika
Pingback: Inuit - Fighters of Arctic - ভূগোলিকা-Bhugolika
Pingback: The Chronicle of Palash of Purulia - ভূগোলিকা-Bhugolika
Pingback: WBSSC GROUP-D SYLLABUS - ভূগোলিকা-Bhugolika